ভগবৎ তত্ত্ব অনির্বচনীয় এবং অব্যক্ত, যা আমরা শুধুমাত্র ভাষা দ্বারা প্রকাশ করার চেষ্টা করতে পারি। সেই ভাষাই যখন সুর দ্বারা যুক্ত হয়ে সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় তখন তা আরও চিত্তাকর্ষক ও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “বাক্য যেখানে শেষ হইয়াছে, সেইখানেই গানের আরম্ভ। যেখানে অনির্বচনীয় সেইখানেই গানের প্রভাব। বাক্য যাহা বলিতে পারে না গান তাহাই বলে” (জীবনস্মৃতি—গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ)।
ভারতবর্ষ ভক্ত-সাধক, জ্ঞানী গুণী, মহামানব, মুনি ঋষির দেশ। যুগে যুগে ভগবান অবতার গ্রহণ করে মর্ত্যে এসেছেন।লোকে সাধারণত জয়দেবের দশ অবতারের কথা জানলেও বিভিন্ন গ্রন্থে অবতারের সংখ্যা বিভিন্ন। সব অবতারের কথা সকলের জ্ঞাত নয়। প্রকাশিত এমনি এক নাম শ্রীশ্রীললিতানন্দ ব্রহ্মচারী। অবিভক্ত বাঙলায় তাঁর আবির্ভাব ১৫ই অগ্রহায়ণ ১৩২৩/ইংরাজী ৩০শে নভেম্বর ১৯১৬। হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়া মহকুমার রাজাপুর থানার অন্তর্গত রঘুদেবপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন রঘুদেবপুর গ্রামে (ডাকঘর-রঘুদেবপুর-৭১১৩২২) এক সাধারণ ব্রাহ্মণ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শ্রী হৃষীকেশ গঙ্গোপাধ্যায়, মাতা শ্রীমতী সরোজিনী দেবী। তিনি বাল্যকাল থেকে পূজাপাঠ, শাস্ত্রচর্চা করতেন। যৌবনে জ্যোতিষচর্চাও করেন। এতে তাঁর নামডাকও হয়। জ্যোতিষ জানার ফলে তিনি জানতেন তাঁর জীবন নদী কোন দিকে বইবে। সাধন ভজনে মেতে থাকতে থাকতে তাঁর মধ্যে মহাভাবের বিকাশ হয়। এই ভাবের স্থায়িত্ব আট-নয় মাস বলে জানা যায়। এই সময় থেকে তাঁর তিরোধান ২৬শে কার্ত্তিক ১৩৬৭/ ইংরাজী ১২ই নভেম্বর ১৯৬০ পর্যন্ত তাঁর যা কিছু দর্শন ও সাধনোপলব্ধি তা তিনি সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রকাশ করতে থাকেন। তাঁর চুয়াল্লিশ বৎসর আয়ুষ্কালের শেষ দশ বৎসরে প্রকাশিত হয় “সাধনা গীতি” ও “গীতি সুধা” পুস্তক দুটি। প্রতিটি পুস্তক পাঁচ খণ্ডে বিভক্ত। প্রতি খণ্ডে একশত করে মোট এক হাজার গান লিপিবদ্ধ। এছাড়াও প্রকাশ করেন দুটি জীবনীমূলক পুস্তিকা “ শ্রীশ্রীগৌরাঙ্গ লীলামৃত” ও “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলামৃত”; প্রতিটিতে পঁচিশটি করে গান আছে। এই পুস্তক সমূহ সাধক ও গৃহী সকলের কাছে সমাদৃত হয়েছে। শুধু পড়ে গেলেও সাধনা হয়, মন প্রাণ ভক্তিরসে আপ্লুত হয় এবং ভগবৎপ্রীতি ও আনন্দময় ছন্দ অন্তরে সাড়া দেয়। এছাড়াও কিছু রচনা আছে যেগুলি তিনি প্রকাশ করে যেতে পারেননি। তিনি গানে নিজ পরিচয় দান করেছেন-
সাধারণতঃ মহাপুরুষদের জীবন ও বাণী সম্পর্কে জানতে পারা যায় তাঁদের ভক্ত, প্রেমিক ও অনুরাগীদের লেখা ও বর্ণনা থেকে। যেমনটি শ্রীরামকৃষ্ণের শ্রীমুখ নিঃসৃত বাণী সম্পর্কে আমরা জানতে পারি শ্রীম রচিত “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত” থেকে । শ্রীশ্রীললিতানন্দ তাঁর সমস্ত বলার কথা সবই স্বহস্তে লিখেছেন এবং তা ছাপিয়ে পুস্তকাকারে সকলের জন্য রেখে গেছেন। ভাগবতী ভাব প্রকাশের জন্য ভগবান শুধু বাঙ্ময় হন নি, নিজেই কলম ধরেছেন-
দেশে ধর্মগ্রন্থের অভাব নেই। বহু সাধকের রচিত বহু গানও আছে। আমরা শ্রীশ্রীললিতানন্দের সঙ্গীতগ্রন্থ কেন পাঠ করবো এই কথা উঠতেই পারে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে সর্বশাস্ত্রের সার বলা হয়ে থাকে। “সাধনা-গীতি” ও “গীতি-সুধা”র মধ্যেও সর্বশাস্ত্র মন্থনে উত্থিত অমৃত সঞ্চিত আছে। যাঁরা জিজ্ঞাসু, অনুসন্ধিৎসু হয়ে বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠ করেছেন, জ্ঞানী গুণী মহাপুরুষের সঙ্গলাভের সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরা এই গানগুলির মধ্যে কী মহা মূল্যবান জিনিস আছে তা সহজে উপলব্ধি করবেন; এ গুলি পাঠ করে অমৃত আস্বাদন করবেন। অনুভব করবেন এ যেন তাঁদের জন্যই রচিত। এছাড়া গীতা সংস্কৃতে লেখা,সর্বজনের সহজবোধ্য নয়; কিন্তু শ্রীশ্রীললিতানন্দ সহজ সরল বাংলা ভাষায় গানের ছলে ধর্মসাধনার মর্মকথা প্রকাশ করে গেছেন। এ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন--
বর্ণনা করা হয়েছে। ‘আপন মনের মাধুরী মিশায়ে’ যিনি যেভাবে ঈশ্বরকে দেখতে ও পেতে চেয়েছেন, ঈশ্বর সেই ভাবেই তাঁর কাছে ধরা দিয়েছেন-
“আমি সেই এক, আঁখি মেলে দেখ, বহুভাবে আমার বিকাশ;
(যেমন) একই আলো, কাঁচের গুণেতে, বহু রঙে হয় রে প্রকাশ।।”...(গীতি-সুধা ৬)
সাধারণতঃ যিনি যে রূপেই ঈশ্বরকে পেয়ে থাকুন বা উপলব্ধি করে থাকুন, তিনি ভাবেন এর বাইরে ঈশ্বরের আর কোন রূপ নেই। এ ভাবনা সংকীর্ণতা, গোঁড়ামি; সত্যের অপলাপ। তবে দ্বন্দ্বের কোন জায়গা নেই, কারণ সকলই সত্য, তবে তা অন্ধের হস্তী দর্শনের মত আংশিক সত্য, পূর্ণতঃ নয়।
ঈশ্বরতত্ত্ব বা সাধনার কোন পথ অনুসরণযোগ্য তা নিয়ে মতবিরোধ নতুন নয়। কিন্তু যে পথেই সিদ্ধিলাভ হোক না কেন তাতে অসুবিধা নেই।শ্রীরামকৃষ্ণের “যত মত তত পথ” বাণী এ জন্য হিন্দুধর্মের সার কথা হয়ে উঠেছে। এই বাণীই যেন নানা ভাবের সংঘাতে বিদীর্ণ বর্তমান কালের মুশকিল আসান, সঠিক পথের দিশারী।
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মতাবলম্বীগণ মনে করেছেন তাঁরা যে অবতারকে মানেন তিনিই শেষ অবতার। বৈষ্ণবদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন শ্রীগৌরাঙ্গের পরে আর কোন অবতার নাই। তাই শ্রীরামকৃষ্ণের অবতারত্ব তাঁরা মানতে চান না।
এ ব্যাপারে শ্রীশ্রীললিতানন্দ জানাচ্ছেন--
এখানে আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই বা ধর্মসংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই--এ কথা বলা হয় নি; যিনি অবতীর্ণ হন তাঁকে ইনি পাঠিয়ে থাকেন বলা হয়েছে যা গীতার বাণীকেও ছাড়িয়ে গেছে অর্থাৎ তিনি নিজেকে ‘অবতরী’ বলেছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, “আর একবার আসতে হবে”।“বায়ুকোণে আর একবার (আমার) দেহ হবে” (কথামৃত ভবন থেকে প্রকাশিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত ৪/৪৫,২৩৭)। শ্রীশ্রীললিতানন্দের এই গানটি যথেষ্ট ইঙ্গিতবাহী--
বিহারের মানভূম জেলা থেকে বাংলাভাষীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এমন একাংশ বের করে পুরুলিয়া জেলা হিসাবে পশ্চিমবঙ্গে যুক্ত হয় ১লা নভেম্বর, ১৯৫৬। এর পর সেখানে তিনি গিয়েছেন ও বেশ কিছুকাল থেকেছেন। এই গান সেই সময়ে লেখা।
তিনি সপার্ষদ এসেছিলেন সংগোপনে । তার দৈনন্দিন জীবনযাপন ছিলো অতি সাধারণ,অনাড়ম্বর | তার কাজ ছিল তার কাছে আসা সকল মানুষের সঙ্গে ভগবৎ প্রসঙ্গে আলোচনা করা এবং তাদের সঙ্গে নিজ রচিত গান গেয়ে নামানন্দে মেতে থাকা ও সকল কে আনন্দে মাতানো । "নিজে হরি মোর হরি গুন্ গায়ে" । ভগবান নিজেই ভক্ত হয়ে কিভাবে ভগবান কে "প্রাণের কথা গানের ছলে " নিবেদন করতে হয় তা লিখে, গেয়ে গাইয়ে দেখিয়ে গেলেন ।এই ভাবেই জগৎ মাঝে রেখে গেলেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত এবং দিয়ে গেলেন ঈশ্বর প্রাপ্তির এক সহজ সরল পথের সন্ধান ।
যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রীশ্রীললিতানন্দের গানগুলি আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ইন্টারনেটে প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি নিতান্তই অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক এক উদ্যোগ। সর্বসাধারণের জ্ঞাতার্থে এ উদ্যোগ নেওয়া হোল। গানগুলি গাওয়ার সুবিধার্থে কয়েকটি গানের স্বরলিপি ও কয়েকটি গানের অডিও/ভিডিও প্রকাশ করা হোল। ফটো গ্যালারিতে রইলো শ্রীশ্রীললিতানন্দের স্মৃতি বিজড়িত কয়েকটি ছবি ।
৫ই শ্রাবন ১৪৩১ (21st July 2024)
গুরু পূর্ণিমা
সেই সময় গ্রীস দেশে অনেক দেব দেবীর পূজা অর্চনা হতো। আমাদের দেশের মতোই তাদের দেশে অনেক দেবদেবী ছিলেন। ৪০০ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টানিটি আসার আগে, গ্রিসে অনেক দেবদেবী ছিলেন । সেই রকমই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান যার নাম ডেলফি। সেখানে এক দেবী পূজিত হতেন। তখন মন্দিরে নাকি দৈববানী হোত। একদিন সেই ডেলফির মন্দিরে দৈববানী হল যে এথেন্স শহরে সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষের নাম সক্রেটিস। খবরটা সক্রেটিসের কাছে আসে। এখন দৈববানী অস্বীকার করা যায় না। তাই সক্রেটিস ভাবলেন, যদি আমি সত্যিই জ্ঞানী হই তাহলে আমার দরকার অন্য জ্ঞানী মানুষদের সংস্পর্শে যাওয়ার। সক্রেটিস বিভিন্ন জ্ঞানী মানুষদের কাছে যেতে শুরু করলেন এবং তাদের প্রশ্ন করতে থাকলেন। দেখা গেল প্রতিটা ক্ষেত্রেই প্রশ্নোত্তর পর্ব এগিয়ে যেতে যেতে এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি তারা হচ্ছেন যার উত্তর তাদের কাছে নেই এবং তথাকথিত জ্ঞানী মানুষরা সক্রেটিসের প্রশ্নে অত্যন্ত বিরক্ত হচ্ছেন, রেগে যাচ্ছেন। এমনি যখন ঘটছে প্রতি জনের ক্ষেত্রেই, সক্রেটিস ভাবলেন তাহলে আমি সত্যিকারের জ্ঞানী এই এথেন্স শহরে। কারণ "আমিই একমাত্র জানি যে আমি সব জানি না"। এটা সক্রেটিসের একটা বিখ্যাত উক্তি, এটাকেই ভিত্তি করে প্লেটো পরবর্তীকালে তার ডায়ালগ গ্রন্থটি লেখেন। ঘটনা হচ্ছে সক্রেটিস এবং তার ছাত্র প্লেটোর অনেক আগেই আমাদের ভারতীয় দর্শনে ডায়ালগের কথা বলা হয়েছে। প্রাচীনকালে গুরুগৃহে একটি অধ্যায় থাকতো যাকে বলা হত পরিপ্রশ্ন। এখানে শিষ্য গুরু কে প্রশ্ন করতেন, তর্কে জেতার জন্য নয়, সত্যকে অনুধাবন করার জন্য। অনেক সময় শিক্ষকের সঙ্গে একমত না হয়ে নতুন দার্শনিক ঘরানা তৈরি হতো। এমনি করে ই দ্বৈত, বিশিষ্টাদ্বৈত, অদ্বৈত, ন্যায়, নব্য ন্যায় , বৈশেষিক ন্যায় প্রভৃতি আলাদা আলাদা দার্শনিক স্কুলের বা ঘরানার জন্ম হয়েছে। একাদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরি শৈব দার্শনিক অভিনব গুপ্ত তর্ককে অষ্টাঙ্গ যোগের উপরে স্থান দিয়েছেন। এখানে প্রশ্নটা ঠিক এটা নয়। এই প্রসঙ্গে প্রশ্নটা হচ্ছে, তিনিই জ্ঞানী যিনি মনে করেন তিনি সব কিছু জানেন না। রবীন্দ্রনাথ বলছেন- 'আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে/ সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে / নিজেরে করিতে গৌরব দান, নিজেরে কেবলই করি অপমান ' ঠাকুর শ্রীললিতানন্দ' কি বলছেন?? "পাণ্ডিত্যের অভিমান, দাও দূর ক'রে;/ "কিছুই জানিনা আমি", বল প্রাণ ভরে।/ তাতেই ঝরিবে ধার,/ পরিবি প্রেমের হার,/ নতি ভাব সুখ সার, জেনো সদা ওরে"।। ঠাকুর পৃথিবীর মানুষকে বারংবার এই সত্যর মুখোমুখি এনেছেন এবং আনছেন। কতভাবে যে তিনি তার কাজ করিয়ে নিচ্ছেন কত মানুষের মাধ্যমে তা অপার বিস্ময় ।এই গানের শুরুতে ঠাকুর বলছেন- "ভাবের অভাব যার, সেই ব'কে মরে;/ পূর্ণ হইলে কুম্ভ, শব্দ নাহি করে"। এই গানটি শ্রীললিতানন্দ রচিত 'গীতি-সুধা' গ্রন্থের ১৫ নম্বর গান। অর্থাৎ যিনি প্রকৃত জ্ঞানী তিনি শুনবেন, নিজের মত জাহির করার থেকেও শোনাটা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়। এ কারণেই প্রকৃত অর্থে শুনতে পারা একটি অতি বড় আধ্যাত্মিক গুণ।
সোমবার, ২৯শে চৈত্র ১৪৩২, নীল ষষ্ঠী